মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

১। সাবেক ষ্পীকার মো: আ: হামিদ চৌধুরী

২। সাবেক রাষ্টপ্রতি মো: আবু সাইদ চৌধুরী

৩। সাবেক পরাষ্ট মন্ত্রী মো: আবুল হাসান কায়সার চৌধুরী

৪। বিচার প্রতি  সুপ্রিমকোট  ঢাকা মো: শামীম হাসনাইন

৫।সাবেক জয়েন সেক্রেরেটারী মরহুম বছির উদ্দিন

আলী শাহান শাহ্ বাবা আদম কাশ্মিরী: জন্ম পনেরো শতক, মৃত্যু ১৬১৩ সাল। ধর্মপ্রচারক ও পীর ছিলেন। বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসায়েন শাহ কর্তৃক আতিয়ার জায়গিরদার নিযুক্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। ১৫৯৮ সালে জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে আলী শাহান শাহ্ বাবা আদম কাশ্মিরীকে আতিয়া পরগণা দান করা হয়। আতিয়া শব্দের অর্থও দান। তিনি দীর্ঘ ১৫০ বছর পরমায়ু লাভ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। তিনি নিজের ব্যয়ের জন্য রাজকোষ থেকে সামান্য কিছু অর্থ গ্রহণ করে অবশিষ্ট অর্থ জনকল্যাণে যেমন : মক্তব, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট তৈরিতে ব্যয় করতেন। তাঁর আমলে উৎকৃষ্ট শ্রেণীর কাগজ তৈরি হতো আতিয়াতে। শাহন শাহ্ বাবা কাশ্মিরী ১৬১৩ সালে মৃত্যুবরণ করলে আতিয়াতেই তাকে সমাহিত করা হয়। আজও আতিয়াতে তাঁর মাজার আছে। মৃত্যুর পূর্বে বাবা কাশ্মিরী প্রিয়ভক্ত সাঈদ খাঁকে আতিয়া পরগণার শাসনভার অর্পণ করেন এবং তাঁর পরামর্শক্রমে সুবেদার ইসলাম খাঁর সুপারিশে দিল্লির মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালে সাঈদ খাঁকে আতিয়া পরগণা ও বাবা কাশ্মিরীর ভাগিনা শাহজামানকে কাগমারী পরগণার শাসনর্কতা নিয়োগ করেন। এই সাঈদ খাঁ করটিয়া জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা।

শাহজামান: জন্ম আনুমানিক ষোলোশতক। মৃত্যু ১৬৬৩ সালে। তিনি ঐতিহাসিক কাগমারী পরগণার সুশাসক ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা বিশিষ্ট আলেম হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় টাঙ্গাইল পিতল, কাঁসা, তাঁতবস্ত্র, দই, মিষ্টি ইত্যাদিতে সুখ্যাতি অর্জন করে। তিনি কাগমারীতে একটি মক্তব স্থাপন করেন। পরবর্তীতে মওলানা ভাসানী এখানে এম.এম আলী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। শাহজামান ছিলেন আতিয়া পরগণার শাসনকর্তা বাবা আদম শাহ্ কাশ্মিরীর স্নেহে পালিত ভাগ্নে। বাবা কাশ্মিরীর অনুরোধেই বাংলার মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ ১৬০৮ সালে কাগমারী পরগণার শাসনকর্তা হিসেবে শাহজামানকে নিযুক্ত করেন। ১৬০৮ সালে কাগমারী পরগণায় শাসনর্কতা নিয়োগের সময় শাহজামানের বয়স ছিলো ৩০ বছর। তিনি একটানা ৫০ বছর নিযুক্ত ছিলেন কাগমারী পরগণার শাসকরূপে। তিনি সুবেদার ইসলাম খাঁর আদেশে প্রথম কাগমারীতে ভূমি জরিপ করেছিলেন। প্রজাদের চিকিৎসার জন্য তিনি পরগণার কয়েকটি জায়গায় চিকিৎসক নিয়োগ করে দাওয়াখানা স্থাপন করেন।

মৌলভী মোহাম্মদ নঈমউদ্দিন: মৌলভী মোহাম্মদ নঈমউদ্দীন ১৮৩২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুরুজ গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মৌলভী মোহাম্মদ রুকন উদ্দিন। নইমউদ্দিন উপমহাদেশের মুশির্দাবাদ, এলাহাবাদ, জৈনপুর, বিহার, আগ্রা, দিল্লি প্রভৃতি স্থানের দেশবরেণ্য বিখ্যাত আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদদের নিকট থেকে ইলমে শরীয়ত (জাহেরী) ও ইলমে মারেফাত (বাতেনী বিদ্যা) আয়ত্ত করেন। তিনিই সর্বপ্রথম কোরান ও বোখারী শরীফ অনুবাদ করে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। আপাত দৃষ্টিতে দেখা যায় গিরিশ চন্দ্র সেন পবিত্র কোরানের প্রথম সম্পূর্ণ অনুবাদ করেন; এই অনুবাদ কর্মের প্রথম পথিকৃত মৌলভী নঈমউদ্দিনই। মৌলভী নঈমউদ্দিন কর্তৃক বাংলায় অনূদিত কোরান শরীফের প্রথম খন্ড ১৮৯১ সালে করটিয়ার জমিদার হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নীর আনুগত্যানুসারে মৌলভী গোলাম সারোয়ার সাহেবের সহযোগিতায় করটিয়া মাহমুদিয়া প্রেসে মুদ্রিত ও মীর আতাহার আলী কর্তৃক প্রকাশিত। পৃষ্ঠা ৪০৬ (৬+৪০০) হাদিয়া ২ টাকা ৪ আনা। টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা ‘আখবারে এছলামিয়া’করটিয়া জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনিই সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন ১৮৮৩ সালে। পত্রিকাটি সুদীর্ঘ দশ বছর প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ছোটো বড় মিলিয়ে অর্ধশত গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য বই হলো জোব্দাতুল মাসায়েল (১৮৯২), এনসাফ (১৮৯২), এজবাতে আখেরেজ্জোহর (১৮৮৭), ফতোয়ায়ে আলমগীরী (১৮৯২), কলেমাতুল কোফর (১৮৯৭) ইত্যাদি। ১৯০৮ সালে ২৩ নভেম্বর এই জ্ঞানতাপস মৃত্যুবরণ করেন।

হেমচন্দ্র: ইতিহাসের পাতায় গোপালপুর উপজেলার হেমনগর রাজবাড়ি উল্লেখযোগ্য। হেমনগর রাজবাড়ির রাজা ছিলেন রাজা হেমচন্দ্র। বিখ্যাত আম্বাবীয়ার জমিদার বংশের কালীচন্দ্র চৌধুরীর পুত্র হেমচন্দ্র চৌধুরী। জন্ম ১৮৩৩ সালে। তার নামেই এলাকাটির নাম হয়েছে হেমনগর। তিনি পুখুরিয়া পরগণার একআনি অংশের জমিদার ছিলেন।

হেমবাবু প্রজাকল্যাণে রাস্তাঘাট, পুকুর ইত্যাদি নির্মাণ করেন। পারিবারিকমন্ডলে হেমনগর হিতৈষী নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর বাড়িতেই বর্তমানে হেমনগর কলেজ স্থাপিত। তিনি শিক্ষা প্রসারের জন্য হেমনগরে তাঁর মায়ের নামে শাশীমুখী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এছাড়া তিনি গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে গৃহ নির্মাণ কল্পে জমিদানসহ পিংনা ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল স্কুল, গোপালপুর বালিকা বিদ্যালয় এবং বরিশাল মুক ও বধির বিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দান করেছিলেন। প্রজাদের স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনা করে হেমনগরে স্থাপন করেন হরদূর্গা দাতব্য চিকিৎসালয়। ম্যালেরিয়ার স্বর্গরাজ্য বলে কথিত এ অঞ্চলে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে হেমবাবু

ডাকঘর মারফত মাসিক ১৫ পাউন্ড কুননিল ঔষধ বিতরণ করতো। এছাড়া পিংনা দাতব্য চিকিৎসালয়, ময়মনসিংহ ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল নির্মাণে, ময়মনসিংহ পুরাতন হাসপাতালের সৌধ নির্মাণে অনেক অর্থ দান করেছেন। তৎকালে দুর্গম চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে তীর্থযাত্রীদের জন্য লোহার সেতু স্থাপনের জন্য সিংহভাগ অর্থ তিনিই প্রদান করেছেন। কবি ও গীতিকার হিসেবে হেমবাবুর তৎকালে সুনাম ছিলো। তাঁর কয়েকটি কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছিলো। হেমচন্দ্র চৌধুরীর বাড়িতে নাট্যশালাও ছিলো। তবে হেমবাবুর প্রজানিপীড়নের চিত্র পাওয়া যায়। ১৯১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী: টাঙ্গাইলের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের অন্যতম হলেন ধনবাড়ির নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। ১৮৬৩ সালে ২৯ ডিসেম্বর ধনবাড়ি জমিদার পরিবারে তার জন্ম। পিতার নাম জনাব আলী চৌধুরী ও মাতার নাম সাইয়েদা রাবেয়া খাতুন। নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯০৬ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার সদস্য, ১৯১২ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত বাংলা প্রেসিডেন্সী ব্যবস্থাপক সভার সদস্য, ১৯১৬ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় আইনসভার সদস্য, ১৯২১ সালে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য এবং ১৯২৩ ও ১৯২৫ সালে দুই দুই বার কৃষি ও শিল্প বিভাগের মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ১৯০৬ সালে খান বাহাদুর, ১৯১১ সালে নবাব বাহাদুর এবং ১৯১৮ সালে সি আই ই খেতাব লাভ করেন। তিনি নওয়াব ইনস্টিটিউশন, নওয়াব প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে অকাতরে অর্থ ব্যয় করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নওয়াব আলী চৌধুরী অপরিমেয় অবদান রেখেছিলেন, একথা সর্বজনবিদিত। বঙ্গভঙ্গ রদের পর ১৯১২ সালের ৩ ও ৪ মার্চ কলিকাতায় নওয়াব সলিমুল্লার সভাপতিত্বে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’-এর পঞ্চম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নওয়াব আলী চৌধুরীর তিনটি প্রস্তাব গৃহীত হয় : (১) উচ্চশিক্ষায় পূর্ববাংলা ও আসামের অধিবাসীদের আপেক্ষিক পশ্চাৎপদতার নিরিখে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ ঢাকায় একটি শিক্ষাদায়ক ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাবকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। মূলত এ থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ভারত সরকার কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণার পর থেকে ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ, অর্থাৎ যে দিন ভারতের কেন্দ্রীয় আইন সভায় ‘১৯২০ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট নম্বর ১৮’পাস হয়। সেদিন পর্যন্ত নওয়াব আলী চৌধুরীর চেষ্টার কোনো বিরাম ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির অন্যতম সদস্যরূপে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯১২-১৯২০ সালে পর্যন্ত নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ-রাজের সাথে নানাভাবে দেন-দরবার ও আইনসভায় বিল উত্থাপন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ক্রমাগত ব্রিটিশ সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অর্থাভাব দেখা দিলে নিজের জমিদারির একাংশ বন্ধক রেখে ৩৫ হাজার টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে দান করেন। ছাত্রদের বৃত্তির জন্য দান করেন ১৬ হাজার টাকা। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট ভবনের নামকরণ করেন এই মহৎ ব্যক্তির নামে। বাংলাভাষার প্রতি এই মানবদরদির ভালোবাসাও ছিলো অকৃত্রিম। যার বহিঃপ্রকাশ করেছিলেন বাংলাভাষাকে অবিভক্ত বাংলার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য ব্রিটিশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক পত্র লিখে। এই বরেণ্য ব্যক্তির উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে ঈদুল আজহা (১৯০০), মৌলুদ শরীফ (১৯০৩), ভারনাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল (১৯০০) এবং প্রাইমারি এডুকেশন ইন রুরাল এরিয়াস (১৯০৬)। ১৯২৯ সালে ১৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নওশের আলী খান ইউস্ফজী: জন্ম ১৮৬৪ সালে কালিহাতির চারান গ্রামে। পিতা শওহার আলী। ত্রিরত্ন আব্দুল হামিদ খান ইউস্ফজী (১৮৪৫-১৯১০), রেয়াজউদ্দীন আহমদ মাশহাদী (১৮৫৯-১৯১৯) ও নওশের আলী খান ইউস্ফজী (১৮৬৪-১৯২৪) কেবল সমসাময়িক ও পারস্পরিক আত্মীয় ছিলেন না, তাঁরা একই পথের পথিক ছিলেন।

টাঙ্গাইল মহকুমায় মুসলিম সমাজে তিনিই প্রথম এফএ পাস করেন ১৮৮৭ সালে। উল্লেখ্য, টাঙ্গাইল জেলায় তিনিই প্রথম মুসলমানদের মধ্যে এফএ পাস ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৮৮৯ সালে পাকুল্লায় সাব-রেজিস্টার পদে চাকুরি গ্রহণ করেন। বিভিন্ন ধরনের লেখালেখি করলেও গদ্যে ছিল তাঁর ভালো দখল। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাবলির মধ্যে ‘বঙ্গীয় মুসলমান (১৮৯১)’, ‘শৈশব-কুসুম (১৮৯৫ কবিতার বই, আহম্মদী প্রেস টাঙ্গাইল, ১৩০২ বাং)’, ‘দলিল রেজেস্টরি শিক্ষা (১৮৯৭)’, ‘মোসলেম জাতীয় সঙ্গীত (১৯০৯)’, ‘সাহিত্য প্রভা (১৯১৪)’ইত্যাদি। তিনি ৯ মে ১৯২৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁদ মিয়া): ১৮৭১ সালে ১৪ নভেম্বর সদর উপজেলার অন্তর্গত করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর পিতার নাম হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী। মাতার নাম খোদেজা খানম। তিনি ছিলেন করটিয়ার জমিদারদের মধ্যে সবচেয়ে প্রজাহিতৈষী। তিনি জমিদার তথা ময়মনসিংহ জেলা কংগ্রেস ও খেলাফত কমিটির সভাপতি, বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সহ-সভাপতি এবং নিখিল ভারত কংগ্রেসের নির্বাহী পরিষদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ বিরোধী আযাদী আন্দোলন করে কারাবরণ করেন ১৯২১ সালে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অনমনীয় মনোভাব ও দৃঢ়তার জন্য ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত তাঁর তৈলচিত্রের নিচে লেখা রয়েছে- “One who dified the British.”

চাঁদ মিয়া পিতার প্রতিষ্ঠিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে উচ্চ ইংরেজি শিক্ষার বিদ্যালয়ে উন্নীত করে ‘হাফেজ মাহমুদ আলী ইনস্টিটিউশন’নামকরণ করেন ১৯০১ সালে। ইংরেজ মি. স্মিথকে নিযুক্ত করেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর উদ্যোগে করটিয়ায় ১৯০৬ সালে সারা বাংলার মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ্। এই ধারাক্রমে ১৯১০ সালে করটিয়ায় ইতিহাস খ্যাত মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। চাঁদ মিয়া প্রতিষ্ঠিত পিতামহের নামে করটিয়ার স্থাপিত ‘সা’দত কলেজ’(১৯২৬ সালে) টাঙ্গাইল তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহে শিক্ষা বিস্তারে গর্বোন্নত শিরে দাঁড়িয়ে আছে। এটি বাংলাদেশে মুসলমান প্রতিষ্ঠিত প্রথম বেসরকারি কলেজ। একই বছর অর্থাৎ ১৯২৬ সালে স্ত্রীর নামে রোকেয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পত্র-পত্রিকা, বই পুস্তক প্রকাশনায় অর্থ দান করেছেন। চাঁদ মিয়া ১৯২১ সালে আলীপুর (কলিকাতা) জেলে থাকাকালীন ব্যারিস্টার আবদুস রসুল প্রতিষ্ঠিত ও মুজিবুর রহমান সম্পাদিত ‘দি মুসলমান’পত্রিকার জন্য আর্থিক সাহায্যদান। জনহিতকর কাজের ব্রতে তাঁর বার্ষিক লক্ষ টাকা আয়ের জমিদার ওয়াকফ্ করেছেন। এই ওয়াকফ্ থেকে বৃত্তি পেয়ে ফজিলাতুননেছা জোহা ও এ জববার (চীফ ইঞ্জিনিয়ার) বিদেশে গমন করেন। ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে করটিয়ায় ন্যাশনাল স্কুল স্থাপন করে শত শত চরকা বসান। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অনেক ব্যারিস্টার, হাকিম, চাকুরিজীবী যোগ দিয়েছেন কিন্তু চাঁদ মিয়ার মতো চারলক্ষ টাকা আয়ের ভূম্যাধিকারী নিজেরও সম্পদের মায়া বিসর্জন দিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন কিনা তা আমাদের জানা নেই।

জমিদারদের স্বার্থ রক্ষায় বৃহত্তর ময়মনসিংহের জমিদাররা একটি সংগঠনের জন্য পাঁচশত টাকা চাঁদা চাঁদ মিয়ার কাছে চাইলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ এই সংগঠন প্রজাদের কল্যাণে প্রবর্তিত প্রজা স্বত্ব আইনের বিরোধিতা করতো। মজলুম নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানী বলতেন এ দেশের জমিদাররা সবাই চাঁদ মিয়ার মতো হলে আমি জমিদারি উচ্ছেদ আইন সমর্থন করতাম না। উল্লেখ্য, দানের ক্ষেত্রে ওয়াজেদ আলী খান পন্নী অদ্বিতীয় ছিলেন। এজন্যই তাকে ‘দানবীর’, ‘দ্বিতীয় মহসিন’উপাধিতে ডাকা হতো। ১৯৩৬ সালে ২৫ এপ্রিল শনিবার তিনি ৬৭ বছর বয়সে করটিয়ায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্যার আবদুল করিম গজনবী: দেলদুয়ারের বিখ্যাত জমিদার পরিবারে ১৮৭২ সালে ২৫ আগস্ট আবদুল করিম গজনবীর জন্ম। জমিদারি পরিচালনার পাশাপাশি তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে আবদুল করিম গজনবী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি বঙ্গ বিভক্তির সমর্থক ছিলেন। করিম গজনবী ব্রিটিশপন্থী ছিলেন তাই সরকার কর্তৃক মনোনীত হয়ে স্যার আবদুল করিম গজনবী বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯০৯ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের মুসলমান এলাকা থেকে ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে এবং ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গ প্রেসিডেন্সির মুসলমান এলাকা থেকে ভাইসরয়েস কাউন্সিলে সরকার মনোনীত সদস্য ছিলেন। আবদুল করিম গজনবী ১৯২৩ ও ১৯২৬ সালে পরপর দু’বার ময়মনসিংহ দক্ষিণ-পূর্ব (মুসলমান) এলাকা থেকে বঙ্গীয় আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৮ সালে ‘নাইট’এবং ১৯৩৩ সালে ‘নওয়াব বাহাদুর’খেতাবে ভূষিত হন তিনি। স্যার আবদুল করিম গজনবী ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত বেঙ্গল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। স্যার আবদুল করিম গজনবী রচিত গ্রন্থ : (১) মুসলিম এডুকেশন ইন বেঙ্গল (২) পিলগ্রিম ট্রাফিক টু হেজাজ এন্ড প্যালেস্টাইন (৩) দি ওয়ার্কিং অব দি ওয়ার্কিকাল সিসটেম ইন বেঙ্গল। ব্রিটিশ রাজ্যের কূটনীতিক হিসেবে অনেকবার সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, মিশর, সৌদি আরব প্রভৃতি দেশে গমন করেন। স্যার আবদুল করিম গজনবী ১৯৩৯ সালের ২৪ জুলাই কলিকাতায় বালিগঞ্জে নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।

রজনীকান্ত গুহ : ১৮৬৭ সালে ১৯ অক্টোবর ঘাটাইল উপজেলার জামুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রাধাপ্রসাদ গুহ, মাতা ত্রিপুরা সুন্দরী। শিক্ষাবিদ, সুপন্ডিত, ব্রাহ্মনেতা ও লেখক। এসব পরিচয়ের পাশে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিলো তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গের একজন বড় স্বদেশী আন্দোলন কর্মী। এ জন্য তাঁকে কয়েকবার চাকরিচ্যুত করা হয়। তিনি ১৮৯৩ সালে প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করে, ১৮৯৪ সালে ভবানীপুর এলএমএস কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন ১৮৯৪-৯৬ সাল পর্যন্ত। ২১ জুন ১৯০১-৩০ জুন ১৯১১ সাল পর্যন্ত বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে প্রথমে অধ্যাপক ও পরে অধ্যক্ষ পদে কাজ করেন। সে সময় স্বদেশী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় পদচ্যুত হন। এরপর ১৯১১-৩০ জুন ময়মনসিংহ আনন্দমহন কলেজে, ১৯১৩-কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। সরকারি নির্দেশে পুনরায় পদচ্যুতি ঘটে। এরপর কলিকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হয়ে পরে ১৯৩৬ সালে এর অধ্যক্ষ হন। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, গ্রীক, ফরাসি, ল্যাটিন ভাষা জানতেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ : ১. সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস (মূল গ্রীক থেকে অনুবাদ) ২. আন্টোনিয়াসের আত্মচিন্তা (গ্রীক থেকে অনুবাদ) ৩. মেগাস্থিনিসের ভারত বিবরণ (অনুবাদ) ৪. সক্রেটিস। ১৩ ডিসেম্বর ১৯৪৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

আবদুল হালিম গজনবী : টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৬ সালের ১১ নভেম্বর। তাঁর পিতার নাম আবদুল হাকীম খান গজনবী এবং মাতা ছিলেন রংপুরের পায়রাবন্দর জমিদার যহীর মুহাম্মদ আবু আলীর কন্যা করীমুননেসা খানম। আবদুল হালীম গজনবী লেখাপড়া করেন কলিকাতার সিটি কলেজ-স্কুল ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯০০ সালে কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তদানীন্তন ময়মনসিংহ মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হন। লোকাল বোর্ডের সদস্য ও অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট এবং কলিকাতা কর্পোরেশনের শেরিফ ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত। তিনি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বঙ্গভঙ্গের প্রাক্কালে সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত হন। এক্ষেত্রে হিন্দু-বাংলার ‘মুকুটহীন রাজা’কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। এজন্যই সম্ভবত অন্যান্য কংগ্রেসী নেতার মতো তিনিও বঙ্গবিভাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। পক্ষান্তরে তাঁর অগ্রজ সহোদর স্যার আবদুল করীম গজনবী ‘১৯০৫ সালে বঙ্গবিভাগ কার্যকর হলে শুধু সমর্থনই করেন নি, বরং কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের বঙ্গবিভাগ বিরোধী আন্দোলন প্রতিহত করারও চেষ্টা করেন।’পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার আব্দুল করীম গজনবীকে ‘রাইট গজনবী’(ন্যায়পন্থী গজনবী) এবং আবদুল হালীম গজনবীকে ‘রং গজনবী;’(পথভ্রষ্ট গজনবী) বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি ১৯২৭, ১৯৩১, ১৯৩৫ সালে বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চল থেকে ভারতীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন কমিটি যেমন : বার্মা সেপারেশন কমিটি (১৯৩০), ফেডারেল ফাইন্যান্স কমিটি (১৯৩২-, কনসালটেটিভ কমিটি (১৯৩৩)

ছবি


সংযুক্তি



Share with :
Facebook Twitter