মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

ভাষা ও সাংস্কৃতি

ভাষাঃ

বাংলা, ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠিরভাষা।

টাঙ্গাইলের মধুপুর এর ভাষা ও সংস্কৃতি টাঙ্গাইলের ভূ-খন্ড বৈচিত্রময়। জেলাটি ঐতিহ্যবাহী ও বহু বৈচিত্রমন্ডিত সুপ্রাচীন জনপদ। বাংলাদেশের জেলাসমূহের মধ্যে ১৯তম জেলা টাঙ্গাইল। আগে এই জেলার ভূ-খন্ডটি ছিল নাসিরাবাদ জেলা (বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলা)। ঐতিহাসিকদের মতে প্রাচীন টাঙ্গাইল আদিকালে আসাম কামরূপ জেলার অংশ ছিল। এখানে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ মে মহকুমা স্থাপন হয়। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে মহকুমাটি স্থানান্তর হয়। আর সেই মহকুমাটি ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১ ডিসেম্বর জেলায় পরিণত হয়। টাঙ্গাইল জেলার উত্তরে ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলা, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর জেলা দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে যমুনা নদী ও সিরাজগঞ্জ জেলা। এজেলার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা। পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে রয়েছে যমুনা ধলেশ্বরী, ঝিনাই, বৈরান লৌহজং, মরা আত্রাই প্রভৃতি নদী। আর মাঝখানে রয়েছে খাল-বিল, বাওর, রাখ ও শাখা নদী বেষ্টিত সমতল ভূমি। এ জেলার অবস্থান গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা অববাহিকার প্রায় মধ্যভাগে। তাই এখানকার ভাষা ও সংস্কৃতি বৈচিত্রময়। একটি জাতির উন্নতির চাবিকাঠি হলো তার ভাষা ও সংস্কৃতি। টাঙ্গাইলের প্রধান ভাষা বাংলা। ব্যবহারের দিক থেকে বাংলা পৃথিবীর সপ্তম ভাষা। এই ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে বাঙ্গালীদের রক্ত দিতে রয়েছে। এই রক্ত দেওয়ার ফলে আজ বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষায় স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলা আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা। টাঙ্গাইল জেলার বসবাসকারী আদিবাসীদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে গারো সম্প্রদায়ই বেশি। হাজং, মান্দি ও কোচ উপজাতিদের সংখ্যা খুবই কম। গারোদের মাতৃভাষা গারো। আচিক ভাষা হচ্চে গারোদের স্ট্যান্ডার্ড ভাষা। কিন্তু মধুপুর অঞ্চলের গারোরা আচিক ভাষায় কথাবার্তা বলে না। তারা আঞ্চলিক আবেং ভাষায় নিজেদের মাঝে কথাবার্তা বলে। গারো ভাষায় লিখিত কোনো বর্ণমালা নাই। কথিত আছে যে, গারোরা যখন তিববত থেকে এদেশে আগমন করে, তখন যার জিম্মায় গারো ভাষায় পশু চর্মে লিখিত যে সমস্ত বই পুস্তক ছিল, তিনি ক্ষুধার জ্বালায় পথিমধ্যে সমুদয় বই পুস্তক সিদ্ধ করে খেয়ে ফেলেন। বিষয়টি অনেকদিন গোপন থাকার পর যখন জানাজানি হয় তখন আর কারো পক্ষে গারো বর্ণমালা স্মরণ করা সম্ভবপর হয়নি। বর্তমানে গারোরা পারিবারিক মন্ডলে নিজেদের ভাষায় কথা বললেও কর্মক্ষেত্রে তারা বাংলা ভাষাই ব্যবহার করেন। কিন্তু গারোদের ভাষার বৈচিত্র রয়েছে। সাধারণভাবে গারো সম্প্রদায়ের ভাষা আচ্ছিক কুচ্চিক ও মান্দি কুচ্ছিক এ দুই ভাগে বিভক্ত। এরপরও বিভিন্ন গোত্রের পৃথক ভাষায় প্রচলন আছে। উনিশ শতকের সত্তরের দশকে ঢাকায় সিভিল সার্জন মিস্টার জেমস ওয়াইজের লেখা ‘নোটস অন দ্যা রেসেস ফাস্ট এ্যান্ড ট্রেডস অফ ইস্টার্ণ বেঙ্গল’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছে বহু ভাষা একত্রিত হয়ে হয়েছে গারো ভাষা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে ত্রিপুরাদের ভাষায় চাউলকে যেমন মিরং বলে তেমনি গারোরাও চাউলকে মিরং বলে। বাঙ্গালীর বাংলা ভাষা ছাড়াও টাঙ্গাইলের জনপদে আদিবাসী সম্প্রদায়ের আরো নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। টাঙ্গাইলের কোচ সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা আছে কিন্তু তাদের ভাষার কোন বর্ণমালা নেই। বিখ্যাত গবেষক হাডসনের মতে কোচদের ভাষাটি বাংলা, উড়িষা, গন্ড, হিন্দি, অহম ও ছোট নাগপুরী ভাষার সংমিশ্রনে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এ ভাষাটিকে একটি ক্ষণজন্মা ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আদি কোচদের ভাষার সঙ্গে হাজং ও অহমীদের ভাষার কিছু কিছু মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে উচ্চারণের বৈপরীত্যও লক্ষ করা যায়। আদিকালে এরা উভয়ই একই। ভৌগলিক এলাকার বাসিন্দা ছিল। যেমন পূর্বে কোচ ও হাজং উভয় সম্প্রদায়ই হাজো নগরের আদি অধিবাসী। কোচদের মাঝে যখন হিন্দুকরণ প্রক্রিয়া ব্রাহ্মণ রাজ্যে প্রবেশ করে, তখনই রাজানুকূল্যে ব্রাহ্মণরা অহমীয়া ভাষায় সংস্কৃতি সাহিত্যের অনুবাদ ও প্রচার করে। এতে অহমীদের ভাষার প্রভাব পড়ে কোচদের কথ্যভাষার উপর। ফলে কোচ ভাষার সঙ্গে অহম ভাষার সংমিশ্রন ঘটে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ও বাংলাভাষী। কিন্তু উচ্চারণ শব্দ অর্থ ইত্যাদি বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দুই দেশের ভাষার কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। দুই অঞ্চলের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় রীতি নীতির ভিন্নতার কারণে দুই অঞ্চলের ভাষায় মধ্যে এই পার্থক্য। তবুও দুই দেশের বই পুস্তকের ভাষায় অধিকাংশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ভিন্নতা প্রকাশ উপভাষা ও আঞ্চলিক ভাষাগুলোতে। টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষা সরলতা পূর্ণ। টাঙ্গাইলের চারপাশের পাঁচটি জেলার অনেক শব্দই টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষা স্থান পেয়েছে। এ কারণে টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষায় নিকট পাঁচটি জেলার অনেক শব্দ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। টাঙ্গাইলের লোক সাহিত্য, পুঁথি সাহিত্য ও প্রবাদ প্রবচনে ঐ ধারাটি লক্ষ্যনীয়। টাঙ্গাইল সদর থেকে জেলার চার দিকের দশ মাইলের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। নানা রকমের আঞ্চলিক শব্দ এবং উচ্চারণের ভিন্নতা। উত্তর এবং দক্ষিণের উচ্চারণে লক্ষ করা যায় ব্যাপক পার্থক্য। এ জেলার উত্তরাঞ্চলের উচ্চারণের সঙ্গে ময়মনসিংহের টান যেমন লক্ষ করা যায়, তেমনি দক্ষিণাঞ্চলের কিছু অংশ এবং পশ্চিমাঞ্চলে সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের টান কানে বেজে ওঠে। টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর অঞ্চলে আদিবাসী বসতি রয়েছে। এদের ভাষাও স্বতন্ত্র। যেমন- মিখো চাবো চিখো রিংবো চেং চেং চানাম বে চেং চেং চাওছে ওবাং মাগেন কারি নাম জাওয়া বাংলা-ভাত খাও পানি খাও টক খেয়ো না টক খেলে পেটের ব্যাথা ঘা শুকাবে না। তরুণ গবেষক শফিউদ্দিন তালুকদার তাঁর ভূঞাপুরের জনজীবন ও সংস্কৃতি গ্রন্থে ভূঞাপুরের চরাঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা, ভাষার উচ্চারণ ও শব্দের ব্যবহার সম্পর্কিত একটি চমকপ্রদ মেয়েলী ঝগড়ার অংশবিশেষ উল্লেখ করেছেন। তাহলো- ‘ড্যাহরডা আগে ভালাই আছিলো।’ ব্যাবাক কামেই অতো ছককল ধরে নাই।’ অতো দগল-ফসল কতাও কয় নাই। কতায় কতায় ফলনা-দকনাও দ্যাহায় নাই। পত্তি বিষুদবারে গোদাইর আটে যাওনের সুম হইছ করছে, কি কি হদাই আনোন লাগবো। এ্যাহোন আমার কাছে কিছুই হইছ করে না। আন্দো ঘরের বোগলেই আহে না। ওশোরাত থিকাই দেরিব্যাড়া দিয়া বাইর অইয়্যা আটে যায়। হইছ কোরবো ক্যা? ওই যে হুবুচুনি একটা নিহা কইরা নইছে। এ্যাহন হে যা কয় তাই হুনে। তার হাথে এ্যাকটা ব্যাফাস কতাও কয় না। এই ড্যাহোরের জোনতেই তো মাগির এ্যাতো ডোমফাই।’ এরকম বহু আঞ্চলিক ভাষার উদাহরণ রয়েছে। এ জেলার উত্তরাঞ্চলের, দক্ষিণাঞ্চলের ও পূর্বাঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায়। লেখাটি সংক্ষিপ্ত করণের জন্যই শুধু কিছু শব্দের আঞ্চলিকতার উদাহরণ আলোকপাত করা যাক। পুঁথি রচিয়তা জনাব শাহজাহান মিঞা ‘আগেকার ম্যালা কথা’ পুঁথিতে টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষার কিছু চিত্র তুলে এনেছেন। যেমন- ‘বাঙ্গালিদের মূল ভাষার গাইবো যে চরণ বাংলা শব্দ উইঠা অইলো আরেক ধরণ। বাঙ্গালিদের বাঙ্গালিত্ব্যের রাইখো যে স্মরণ লুঙ্গিরে যে তফন কইছি শার্টে রে পেরন। কাঠা রে যে চোবা কইছি বৃষ্টি রে যে দেওয়া নড়ি রে যে পাজুন কইছি সুপারি রে গুয়া। মইয়ের ভিতর খিল লাগাইছি তারে কইছি কোওয়া জামাই মইরা বিধবা অইছে তারে কইছি বেওয়া। ঘরের পিছন কাইনছাল কইছি গরমে রে গুমা আটুর উপর কাপড় পড়ছি তারে কইছি ডুমা। চুনে রে যে দই কইছি লবণেরে নুন জামাই রে যে দামান কইছি ভাল রে যে গুণ। বারিন্দা রে উশরা কইছি মাচিরে উগার ঝগড়া রে যে কয়চান কইছি ধৈর্যেরে সুমার। ঠান্ডারে যে টেলকা কইছি গরমেরে ততা ছিড়া কাপড় দিয়া আমরা বানাইছি যে খেতা। বাতি রে যে হলক কইছি অনেকে রে ম্যালা ছিলিং এ-রে চাং কইছি সূর্য্য রে বেলা। পোলা রে যে গেদা কইছি বাপে রে বাজান মাছ থাকছে মান্দা ভরা গোলা ভরা ধান। আদর রে সোয়াগ কইছি দোষের ছক্কল শীতে রে যে জার কইছি মাতববর রে মোড়ল। তরকারি রে শালুন কইছি রসা রে যে ঝোল সারী সারী নাও ভিরাইছি তারে কইছি কোল।’

 

 

 

ছবি


সংযুক্তি



Share with :
Facebook Twitter